অপহরণ থেকে হুমকি—চার্জশিটের পরও নিরাপত্তাহীন ব্যবসায়ী নেতা সোহাগ

এক বছর পেরিয়ে চার্জশিট, সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ; নিরাপত্তার জন্য জমা দেওয়া বৈধ অস্ত্র ফেরত চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন।

একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নেতা। নারায়ণগঞ্জের ব্যস্ত নগরীর একটি সড়ক থেকে তাকে অস্ত্রের মুখে তুলে নেওয়ার অভিযোগ। এরপর নারায়ণগঞ্জ থেকে পটুয়াখালী। এক রাতের মধ্যে যেন হারিয়ে যায় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। পরদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় উদ্ধার হলেও ঘটনাটি সেখানেই শেষ হয়নি।

অপহরণ মামলার তদন্ত শেষে আদালতে দেওয়া হয়েছে চার্জশিট। সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন আদালত, তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে তদন্তকারী সংস্থা। কিন্তু অভিযোগপত্র গ্রহণের পরও ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ সোহাগ ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের পাশাপাশি চার্জশিটভুক্ত কয়েকজনের প্রকাশ্যে চলাফেরার দাবিও সামনে এসেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে।

সর্বশেষ নিজের জীবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে থানায় জমা রাখা বৈধ লাইসেন্সকৃত পিস্তল ও শর্টগানসহ গোলাবারুদ ফেরত চেয়ে নারায়ণগঞ্জের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করেছেন সোহাগ।

তোলারাম কলেজের সামনে থেকে অপহরণ

মামলার নথি ও প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জুন রাতে ব্যবসায়িক কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজের সামনে থেকে মোহাম্মদ সোহাগকে একটি গাড়িতে তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে পটুয়াখালীর দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরদিন ২ জুন পটুয়াখালীর পায়রা বন্দর এলাকার একটি ফেরিঘাটের কাছ থেকে তাকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করা হয় বলে মামলাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় সোহাগের স্ত্রী তানিয়া আহাম্মেদ বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেন।

মামলাটি ১২(০৬)২৫ নম্বরে এবং দণ্ডবিধির ৩৬৪/৩৪ ধারায় করা হয়।

তদন্তে সাতজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

দীর্ঘ তদন্তের পর পুলিশ সাতজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে আরও তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা আমলি চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অভিযোগপত্রটি গ্রহণ করেন। অভিযোগপত্রের নম্বর ৩১৮।

চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তিরা হলেন—মো. আল আমিন শেখ ওরফে জিতু, মো. কবির হালদার, লতিফ সিদ্দিকী রতন, সাব্বির আহমেদ, ইরান হোসেন মোহন, মো. সাকিব হোসেন ও মো. ছাহাদ।

প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, তদন্তের সময় সাক্ষীদের বক্তব্য, মোবাইল ফোনের যোগাযোগ, ডিজিটাল তথ্য, বিভিন্ন আলামত ও অপহরণে ব্যবহৃত যানবাহনসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা হয়েছে। কয়েকজন আসামির আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দির কথাও চার্জশিট-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

তবে চার্জশিটে কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে এবং সেই অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা কী—তা এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয়নি।

এক বছর পরও আতঙ্ক কাটেনি

২০২৬ সালের জুনে অপহরণের এক বছর পূর্তিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলার প্রধান আসামি হিসেবে উল্লেখ করা আল আমিন ওরফে জিতুসহ কয়েকজন তখনও গ্রেপ্তারের বাইরে ছিলেন। একই প্রতিবেদনে কয়েকজন আসামির জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে, মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে প্রবেশ করার পরও সোহাগের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হচ্ছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে সোহাগের একটি সাধারণ ডায়েরির তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, বিভিন্ন অজ্ঞাতনামা নম্বর থেকে তাকে ও তার স্ত্রীকে ভয়ভীতি দেখানো এবং মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছিল। ব্যবসায়িক ছবি সম্পাদনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকির কথাও ওই জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমনকি ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মামলা প্রত্যাহারের জন্য প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে লতিফ সিদ্দিকী রতন ও সাব্বির নামে দুজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালত বা পৃথক তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার বিষয়।

চার্জশিটের পরও প্রকাশ্যে চলাফেরার অভিযোগ

নতুন করে আলোচনায় এসেছে আরও একটি বিষয়—চার্জশিটভুক্ত কয়েকজন আসামি প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন বলে ভুক্তভোগী পক্ষ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি।

এমন অভিযোগ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, একজন অপহরণ মামলার ভুক্তভোগী ও বাদীপক্ষ যখন নিরাপত্তাহীনতার কথা জানাচ্ছেন, তখন মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকাশ্য চলাফেরার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা কী?

তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উঠেছে, তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মামলাটি বিচারাধীন এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।

নিরাপত্তার জন্য নিজের অস্ত্রই ফেরত চান সোহাগ

নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি কতটা গভীর—সোহাগের সর্বশেষ আবেদন থেকেই তার একটি চিত্র পাওয়া যায়।

জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া আবেদনে তিনি জানান, তার নামে একটি .৩২ বোর এনপিবি পিস্তল এবং একটি শর্টগানের লাইসেন্স রয়েছে। সরকারি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট অস্ত্র দুটি ও সংশ্লিষ্ট গোলাবারুদ ফতুল্লা মডেল থানায় জমা দেওয়া হয়েছিল।

এরপর নিজের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে একাধিকবার অস্ত্র ফেরত পাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১৪ মার্চ নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতির মাধ্যমেও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। সর্বশেষ ২০ সেপ্টেম্বর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবার আবেদন করা হয়।

অর্থাৎ, একজন ব্যবসায়ী নেতাকে অপহরণের অভিযোগের পর মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে, চার্জশিট আদালতে গৃহীত হয়েছে; কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্নে ভুক্তভোগী এখন নিজের নামে বৈধভাবে লাইসেন্স করা অস্ত্র ফেরত পাওয়ার আবেদন করছেন।

ব্যবসায়ী মহলেও উদ্বেগ

মোহাম্মদ সোহাগ শুধু একজন ব্যবসায়ী নন। তিনি নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক এবং মীম শরৎ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত।

ফলে তার অপহরণ ও পরবর্তী নিরাপত্তা পরিস্থিতি ব্যক্তিগত একটি ঘটনা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিষয়টি নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী মহলেও উদ্বেগ তৈরি করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্বেগের মূল জায়গা—একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী যদি অপহরণের শিকার হন এবং পরে মামলা করার কারণে হুমকির অভিযোগ তোলেন, তাহলে সাধারণ ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।

নারায়ণগঞ্জ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও ব্যবসাকেন্দ্র। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার ব্যবসায়ী, শিল্পোদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী ও শ্রমজীবী মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন। তাই একটি আলোচিত অপহরণ মামলার ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু একজন ব্যক্তির বিষয় নয়; এর সঙ্গে ব্যবসায়িক পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলার ওপর আস্থার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।

মূল প্রশ্ন এখনো কয়েকটি

এক বছরের বেশি সময় আগে নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে শুরু হওয়া সোহাগ অপহরণকাণ্ড এখন আদালতের বিচারিক পর্যায়ে। পুলিশের তদন্তে সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

কিন্তু এরপরও কয়েকটি প্রশ্ন সামনে থাকছে—অপহরণের পুরো পরিকল্পনার সঙ্গে কারা জড়িত ছিল? ঘটনার নেপথ্যে আর কেউ ছিল কি না? মামলার ভুক্তভোগীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা কী? চার্জশিটভুক্ত আসামিদের কেউ যদি সত্যিই প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ান, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত অবস্থান কী? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মামলার ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর শেষ পর্যন্ত তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।

অপহরণ থেকে আদালত—শেষ হয়নি গল্প

২০২৫ সালের ১ জুন রাত থেকে শুরু হওয়া এই ঘটনা এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে এখন নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। অপহরণ, উদ্ধার, মামলা, তদন্ত, আসামি গ্রেপ্তার ও জামিন, মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকির অভিযোগ, চার্জশিট এবং সর্বশেষ নিরাপত্তার জন্য বৈধ অস্ত্র ফেরত চেয়ে আবেদন—ঘটনাপ্রবাহটি যেন একটি প্রশ্নের দিকেই বারবার ফিরছে।

একজন ব্যবসায়ী নেতাকে অপহরণের ঘটনায় অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হওয়ার পরও যদি ভুক্তভোগী নিরাপত্তাহীনতার কথা বলেন, তাহলে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

মামলার বিচার এখন আদালতের হাতে। সাত আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হবে কি না, তিনজনকে অব্যাহতির সুপারিশের ভিত্তি কতটা যথাযথ ছিল, হুমকির অভিযোগের পেছনে কারা রয়েছে—সবকিছুর উত্তর মিলবে আইনগত প্রক্রিয়ায়।

তবে নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী সমাজের কাছে এই ঘটনা ইতোমধ্যেই একটি বড় বার্তা দিয়ে গেছে—ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ শুধু বিনিয়োগ ও অর্থের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এর সঙ্গে নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের ওপর আস্থাও সমানভাবে জড়িত।

এখন ব্যবসায়ী নেতা মোহাম্মদ সোহাগ ও তার পরিবারের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হয়, মামলার বিচার কত দ্রুত এগোয় এবং অপহরণ ও পরবর্তী হুমকির অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য কতটা সামনে আসে—সেদিকেই নজর নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষের।

পুরাতন সংবাদ পড়ুন
« নভেম্বর ২০২৫ »
সোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনিরবি
     ১২
৩৪৫৬৭৮৯
১০১১১২১৩১৪১৫১৬
১৭১৮১৯২০২১২২২৩
২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০