দলীয় সন্ত্রাসীদের আস্ফালনে উৎসব ও বন্ধন পরিবহনের মালিক শ্রমিকদের সাহস

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে বাসভাড়া নির্ধারণ নিয়ে প্রশাসনের ডাকা চার ঘণ্টার বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই শেষ হওয়ার পরদিনও যাত্রীদের কাছ থেকে ৬০ টাকা করে ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) উৎসব ও বন্ধন পরিবহনের বাসে এই ভাড়া আদায় করা হয়।

এর আগে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) প্রশাসনের উপস্থিতিতে ভাড়া নিয়ে আলোচনা চলাকালে দুই দফায় সভাকক্ষ ত্যাগ করেন বাস মালিকদের প্রতিনিধিরা। দ্বিতীয় দফায় বেরিয়ে যাওয়ার পর তাঁরা আর বৈঠকে ফেরেননি। ফলে প্রশাসন, ছাত্র প্রতিনিধি ও যাত্রী অধিকার সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে দীর্ঘ আলোচনা হলেও ভাড়া নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

সোমবার বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রশাসনের কর্মকর্তা, বাস মালিক, সামাজিক সংগঠন ও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠকের শুরু থেকেই বাসভাড়া নিয়ে পক্ষগুলোর মধ্যে যুক্তিতর্ক হয়। বাস মালিকদের পক্ষ থেকে মাহবুব হোসেন রতন বলেন, সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী যে ভাড়া নির্ধারিত হবে, সেটিই তাঁরা নেবেন। এর চেয়ে এক টাকা কম বা বেশি নেওয়া হবে না। নারায়ণগঞ্জে বাস মালিকেরা যে পরিমাণ ছাড় দিচ্ছেন, দেশের অন্য কোথাও তা দেওয়া হয় না বলেও দাবি করেন তিনি।
এর জবাবে যাত্রী অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি বলেন, বাসভাড়া নির্ধারণ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তিনি অতীতে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে বলেন, নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজি না হলে শামীম ওসমানকে ‘গডফাদার’ তকমা কেন নিতে হয়েছিল।

রফিউর রাব্বির দাবি, বাস টার্মিনালে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে গুলাগুলির ঘটনাও ঘটেছে। বন্ধন পরিবহনের পক্ষ থেকে একসময় র‍্যাবের কার্যালয়ে চিঠি দিয়ে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানকে কত টাকা করে দেওয়া হতো, তা জানানো হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘সেই চিঠি দেখে আমরা বলেছিলাম, ২২ টাকা থেকে ৩২ টাকা ভাড়া করেছিলেন। তখন বাস মালিকেরা বলেছিলেন, চাঁদা বন্ধ করেন। ভাড়া বাড়ানোর কোনো প্রশ্ন ওঠে না। বরং আমরা কমাব।’
বৈঠকে গণসংহতি আন্দোলনের জেলা সমন্বয়কারী তারিকুল ইসলাম সুজনও পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি নিয়ে অভিযোগ করেন। তিনি দাবি করেন, কিছুদিন আগে বাস মালিকদের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে জাকির খান ও তৈমুর আলমের শ্রমিক দল ‘কালা ফারুক বাহিনী’র হাত থেকে মালিকদের বাঁচানো এবং জাকির খানের প্রভাব থেকে পরিবহন খাত মুক্ত করা গেলে ৫০ টাকা ভাড়া নিয়েও লাভবান হওয়ার কথা বলা হয়েছিল।

বৈঠকের একপর্যায়ে বাস মালিকদের প্রতিনিধিরা সভাকক্ষ থেকে বের হয়ে প্রায় ১৫ মিনিট নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেন। পরে ফিরে এসে সাধারণ যাত্রীর জন্য ৫৭ টাকা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ৩৫ টাকা ভাড়ার প্রস্তাব দেন। তবে ছাত্র প্রতিনিধিরা শিক্ষার্থীদের ভাড়া ৩০ টাকা করার দাবি জানান।
এরপর বাস মালিকেরা আবার সভাকক্ষের বাইরে গিয়ে আলোচনা করেন। ফিরে এসে আগের ৫৭ টাকার প্রস্তাব পরিবর্তন করে সাধারণ যাত্রীর ভাড়া ৬০ টাকা এবং শিক্ষার্থীদের ভাড়া ৩৫ টাকা করার প্রস্তাব দেন।
এ নিয়ে ছাত্রনেতা ও অন্য প্রতিনিধিদের সঙ্গে আবারও তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে বাস মালিকদের প্রতিনিধিরা বৈঠক চলাকালেই সভাকক্ষ ত্যাগ করে চলে যান।
পরে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ফয়েজ উদ্দিন, সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমানসহ ছাত্র ও অন্যান্য প্রতিনিধিরা বাস মালিকদের ফিরে আসার অপেক্ষা করেন। তবে তাঁরা আর না ফেরায় কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।
ইউএনও এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, ‘দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে উভয় পক্ষের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে। তাদের যৌক্তিক দাবিগুলো শুনেছি। উভয় পক্ষকে কিছুটা ছাড় দিয়ে এমন একটি অবস্থানে আসতে বলা হয়েছে, যাতে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে এবং বাস মালিকেরাও ক্ষতিগ্রস্ত না হন।’
তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হলেও পুরোপুরি সমাধানে তারা এখনো আসতে পারেননি। আমরা আশা করছি, খুব দ্রুত বিষয়টির সমাধান হবে।’
ইউএনও জানান, শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ৩৪ টাকা এবং বাস মালিকপক্ষ ৩৫ টাকা ভাড়ার প্রস্তাব দিয়েছে। সাধারণ যাত্রীর ভাড়া নিয়েও বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে। তবে কোনো প্রস্তাবেই চূড়ান্ত ঐকমত্য হয়নি।
এদিকে বৈঠকে কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও মঙ্গলবার ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলাচলকারী উৎসব ও বন্ধন পরিবহনের বাসে যাত্রীদের কাছ থেকে ৬০ টাকা করে ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে।
এদিকে, ছাত্ররা জানিয়েছে, বাসভাড়া যৌক্তিকভাবে করা না হলে তারা কঠোর আন্দোলনে যাবেন।

পুরাতন সংবাদ পড়ুন
« জানুয়ারি ২০২৭ »
সোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্রশনিরবি
    ১২৩
৪৫৬৭৮৯১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০৩১