নারায়ণগঞ্জ ৭১:সোনারগাঁয়ের  মোগরাপাড়া মল্লিকপাড়ার বাইতুল জালাল জামে মসজিদের পেশ ঈমাম দিদারুল ইসলাম (২৬) হত্যাকাণ্ডের ৬ দিন পর রহস্য উন্মোচন সহ ঘাতককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ 

পাওনা টাকা যাতে ফেরত দিতে না হয় সে কারণেই ইমাম দিদারুলকে পূর্বপরিকল্পনা করে একাই হত্যা করে তার বন্ধু ইমাম ওহিদুর জামান (২৮) এমনটি নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। হত্যাকান্ডের পর সোনারগাঁ পুলিশ ক্লুলেস মার্ডার বলে উল্লেখ করলেও অবশেষে ঘটনার ৬ দিনপরই পুলিশেরই একটি চৌকশ টিম ঘটনার ক্লু সহ ঘাতককে গ্রেফতারে সক্ষম হয়।

বুধবার ভোর রাতে মাদারীপুরের শিবচর এলাকা থেকে ইমামের দায়িত্বরত মসজিদ থেকে ওহিদুরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর তাকে নিয়ে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত চাপাতিসহ অন্যান্য আলামত উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘাতক ইমাম ওহিদুর নড়াইল জেলার নড়াগাথি থানার কলাবাড়িয়া পশ্চিম পাড়া আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে।

বুধবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, নিহত ঈমাম দিদারুল ইসলাম ও ঘাতক ওহিদুর রহমান পরস্পর বন্ধু। ভিকটিম দিদারুলের কাছ থেকে সোনার বার কেনার কথা বলে কয়েক দফা লক্ষাধিক টাকা হাতিয়ে নেয় ওহিদুর। দিদারুল টাকা ফেরত চেয়ে চাপ দিলে ঘাতক ওহিদুল তাকে খুনের পরিকল্পনা করে। 

তিনি আরও জানান, সেই পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক ঘটনার আগের রাতে (২০ আগস্ট) দিদারের সাথে মসজিদে দেখা করে ২১ আগস্ট এশার নামাজের পরে পাওনা টাকা ফেরত দিবে বলে জানায়। ঘাতক ওহিদুর শিবচরের পাঁচচর এলাকা থেকে হত্যায় ব্যবহৃত চাপাতিটি ক্রয় করে রাখে এবং সোনারগাঁয়ের মোগরাপাড়া থেকে ঘুমের ঔষধ ও কোকাকোলার বোতল কেনেন। 

পরে কোকের সাথে ঘুমের ঔষধ মিশিয়ে ঈমাম দিদারুল ইসলামকে খাইয়ে অবচেতন করেন। এরপর পূর্ব পরিকল্পনা মোতবেক চাপাতি দিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। হত্যার পর বন্ধুর লাশ ধরে কান্নাকাটি করে ঘাতক ওহিদুল। 

এরপর ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য বন্ধুর  ব্যবহৃত খাতায় সে লিখে রাখে, নিহত ইমাম দিদারুল হিযবুত তাওহিদের সদস্য, সে আমাদের দল থেকে অস্ত্র ও টাকা নিয়ে পালিয়ে এসেছে তাই তাকে আমরা মেরে ফেলেছি।’

পুলিশ সুপার জানান, হত্যাকাণ্ডে পর ঘাতক ওহিদুর মসজিদের ওজু খানায় গোসল করে রক্ত মাখা লুঙ্গী পাশ্ববর্তী একটি পুকুরের কচুরী পানার মধ্যে ফেলে দেয়। পরে  ঢাকা মিরপুর হয়ে মাদারীপুর যে মসজিদে সে ইমামতি করে সেখানে চলে যায়।

পুলিশ সুপার বলেন,  মূলত ঘাতক ওহিদুর পাওনা টাকা ফেরত না দেয়ার জন্যেই পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এবং হত্যাকাণ্ডটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাওহিদের নাম ব্যবহার করে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যার পুরো ঘটনা বর্ণনা করেছে। আসামিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর জন্য বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ২১ আগস্ট রাতে সোনারগাঁ থানাধীন মোরাগরাপাড়া ইউনিয়নের মল্লিকপাড়ার বাইতুল জালাল জামে মসজিদের পেশ ঈমাম দিদারুল ইসলাম (২৬) মসজিদে এশার নামাজের জামাতের পরে তার কক্ষে অবস্থান করেন। 

পরের দিন প্রতিদিনের ন্যায় ভোর রাতে স্থানীয় মুসল্লিগণ ফজরের আজান শুনতে না পেয়ে মসজিদের হুজুরের কক্ষে ডাকাডাকি করেও কোন সাড়া-শব্দ না পেয়ে টর্চের আলোতে মুসল্লিরা দেখেন, কাঠের চৌকির উপর রক্তাক্ত অবস্থায় ঈমাম দিদারুল ইসলাম (২৬)এর দেহ উপুর হয়ে পড়ে আছে এবং মাথাসহ মুখমণ্ডল দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন। 

পরবর্তীতে সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে। ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন। ওই ঘটনায় নিহত ঈমামের ভাই মো. মিজানুর রহমান (২৮) বাদী হয়ে সোনারগাঁও থানায় একটি মামলা দায়ের দায়ের করেন। এ ঘটনার পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ সরেজমিনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। 

মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর হওয়ায় পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নামে। এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক (এসআই) আজাদ এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচন করেন। এবং তার নেতৃত্বেই বুধবার ভোর রাতে মাদারীপুরের শিবচর এলাকা থেকে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।