নারায়ণগঞ্জ৭১: শিল্পী, চাকুরিজীবী, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সাংবাদিক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক থেকে শুরু করে সকল পেশাজীবী মানুষের রোজকার আনাগোনা চাষাঢ়ায় অবস্থিত নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। প্রায় সময় দেখা যায় শহীদ মিনারের এক কোনায় বসে কোন এক শিল্পী আঁকছেন কিংবা সন্তানকে স্কুলে দিয়ে স্কুল ছুটির জন্য অপেক্ষা করছেন কোন অভিভাবক। কিন্তু সোমবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই শহীদ মিনারের মূলগেটসহ ৩টি গেটই বন্ধ দেখা যায়। শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ করে দেয় পুলিশ। কেউ ভেতরে ঢুকতে চাইলে বাধা দেয় শহীদ মিনারে অবস্থারত পুলিশ। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন অনেকেই। পুলিশের এমন অবস্থানে ক্ষোভ প্রকাশ করে সমালোচনাও করেছেন অনেকে।

দুপুর সাড়ে ৩টা। পরীক্ষা শেষে ট্রেনে বাড়ি ফিরবে অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রায়হান কবির। ফতুল্লা রেল স্টেশনের পাশেই তার বাসা। কিন্তু ট্রেন আসতে এখনো আধ ঘন্টা। তাই শহীদ মিনারে কিছুক্ষন বসে ট্রেনের অপেক্ষার উদ্দেশ্যে ঢুকতে গিয়ে দেখেন গেট বন্ধ। গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকতে গেলেই বাধা দেয় শহীদ মিনারে দায়িত্বরত পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) সাইফুল।
শহীদ মিনার বন্ধ কেন জানতে চাইলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, শহীদ মিনারে স্কুল চলাকালীন ছাত্রছাত্রীরা আড্ডা দেয়, শহীদ বেদীতে জুতা নিয়ে ওঠে তাই কারোর প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে। আমি যতদিন দায়িত্বে আছি এভাবেই চলবে।

এদিকে ওই ছাত্র রায়হান কবির বলেন, ‘ট্রেন লেট হবে তাই ভাবলাম এখানে একটু বসি। প্রায় সময়ই এই কাজ করি। কিন্তু আজ এসে দেখলাম শহীদ মিনারে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। শহীদ মিনার বন্ধ থাকবে এটা কেমন কথা? ভাষা-আন্দোলনের স্মৃতিচিহ্ন এটি। বাঙালির চেতনার কেন্দ্রবিন্দু। তাই কোনো অজুহাতেই এটিকে বন্দী করে রাখা চলবে না।’

এদিকে গত শুক্রবার থেকে প্রতিদিন শহীদ মিনারে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাঠদান দিয়ে আসছে ‘শিক্ষালো সেবা’ নামে একটি সংগঠন। সোমবার তাদের পাঠদানেও বাধা প্রদান করে পুলিশ।

সংগঠনটির সংগঠক সাজিত হোসেন বলেন, ‘পথশিশুদের ফ্রি শিক্ষা দেয় আমাদের সংগঠন। জায়গা না থাকাতে আমরা শহীদ মিনারেই এই কাজটি করি। কিন্তু আজকে পুলিশ জানালো শহীদ মিনারে পাঠদান করা যাবে না। প্রয়োজনে আগামীকাল জেলা প্রশাসন থেকে পারমিশন নিয়ে আসতে বলে পুলিশ।’

শহীদ মিনারে প্রবেশ করতেই পুলিশের বাধার সম্মুখীন হন গণমাধ্যম কর্মী মাহমুদুন নবী পিয়াল। তিনি বলেন, ‘শহীদ মিনার যে আজকে বন্ধ বিষয়টা আমি জানতাম না। ভেতরে প্রবেশ করতেই এসআই সাইফুল অশ্লীল ভাষায় আমাকে গালি দেন। কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজকে শহীদ মিনার বন্ধ। এখানে উচ্ছৃঙ্খল আড্ডা বন্ধ করতেই এই ব্যবস্থা বলেও জানান তিনি। তাই বলে শহীদ মিনারের গেট বন্ধ রাখাটা কতটুকু সমীচীন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আগামী তিন-চারদিন এভাবেই বন্ধ থাকবে।’

পিয়াল বলেন, ‘শহীদ মিনার বন্ধ রাখার বিষয়টি অনুচিত। পূর্বে যেমন উন্মুক্ত ছিল তেমনটাই উন্মুক্ত থাকা উচিত। শহীদ মিনারে সবাই প্রবেশ করবে। যদি কেউ শহীদ মিনারের অবমাননা করে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।’
শহীদ মিনার বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক শাহীন মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘শহীদ মিনার একটি মুক্ত চিন্তার স্থান। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পেশার মানুষ এখানে আসে, বসে। সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পীরাও বসে, ছবি আঁকে। এখানে যদি নেতিবাচক কোনো কিছু হয়ে থাকে তাহলে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। কিছু নেতিবাচক কাজের কারণে ইতিবাচক কাজগুলো উপেক্ষা করা এবং শহীদ মিনার বন্ধ করা উচিৎ নয়। একজন সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে আমি এর বিপক্ষে।’

ছাত্রনেতা ফারহানা মানিক বলেন, ‘শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক ঘাটতি আছে। শহীদ মিনার সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ করে দিয়ে তারা তাদের এই ঘাটতি ছাত্র ও সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দিচ্ছে।’

এদিকে শহীদ মিনারে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ করে গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিষয়টি জানেন না খোদ সিটি কর্পোরেশন। শহীদ মিনারে প্রবেশে নিষেধজ্ঞার বিষয়ে জানতে চাইলে সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এএফএম এহতেশামুল হক বলেন, ‘শহীদ মিনার বন্ধ রাখার বিষয়ে আমাদের কোন নির্দেশনা নেই। কেন বন্ধ রাখা হয়েছে সে বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।’
এদিকে বিকেল ৫টার দিকে ফের শহীদ মিনারের গেট খুলে দেয় পুলিশ। এ সময় সর্বসাধারণকে প্রবেশ করতে দেখা যায়।